Posts

ডক্টর কলিতা

আমার প্রথম চাকরির প্রথম পোস্টিং ছিল মিজোরাম রাজ্যের রাজধানী আইজল।  ।।১।। স্থলপথে আইজল পৌঁছতে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হত। প্রথমে পৌঁছে গেলাম আসামের রাজধানী গৌহাটি শহরে। এই শহর থেকে রোজ সন্ধ্যেবেলা একদল বাস বেরিয়ে পড়ত শিলচর নামক প্রান্তিক এক শহরের উদ্দেশ্যে। পুরো রাস্তাটাই অপরূপ মনোরম দৃশ্যে ভরা। সাথে যুক্ত হত মৃত্যুভয় সেইসময় বোড়োল্যান্ড আন্দোলন একেবারে চরমে। মাঝে মাঝেই লুটপাট ও সাধারণ যাত্রীদের মেরে ফেলার খবর পাওয়া যেত, তাই বাসগুলি সন্ধ্যাবেলা গৌহাটি শহর থেকে একসাথে বের হত। আর মাঝের কিছু বাসে সশস্ত্র সিআরপিএফ জওয়ান যাত্রীদের সঙ্গে বসে থাকতেন। এদের কাজ ছিল বিপদ দেখলে প্রতিআক্রমণ করা। যেহেতু সারারাত বাসগুলি চলার পরে সক্কালবেলা  শিলচর শহরে পৌঁছে যেত, তাই এই মেঘালয়ের অপরূপ সৌন্দর্য দেখার অবকাশ থাকত না। যাই হোক সন্ধ্যেবেলায় গৌহাটি শহরের বিরক্তিকর জ্যাম কাটিয়ে বেরোতে বেরোতেই রাত হয়ে যেত। তারপর পথের ধারে কোন ধাবায় বাসগুলোকে দাঁড় করিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করত যাত্রীরা যে যার নিজেদের মত। এইসব করে বের হতে হতে প্রায় রাত এগারটা হয়ে যেত। এরপর ধীরগতিতে সারারাত ধরে বাসের কনভয় মেঘালয়...

ঈদ মোবারক ও বিরিয়ানি ডে

 বিরিয়ানি ডে ---------- ঈদ মানেই বিরিয়ানি খাওয়া এর ওর বাড়িতে গিয়ে। এত গেল ছাত্র জীবনের কথা। এরপরে এলো চাকরি জীবন। শুরুতে কয়েক বছর চরকি কাটার মতন ভারতবর্ষের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ঘুরে বেড়াতাম। মাসে দু -তিনটে করে ফোন নাম্বার বদল করতাম, তার কারণ তখন রোমিং কস্টলি ছিল। আর ফোনের সিম পেতে তেমন ঝামেলা হতো না। একদম রেডিমেড সিম পাওয়া যেত যা ফোনে ঢোকালে সাথে সাথে চালু হয়ে যেত। যাই হোক এইরকম যাযাবর জীবনের মাঝে একবছর আলীগড়ে থাকার সুযোগ হয়েছিল।  সেই সময় আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিতে লাইব্রেরী অটোমেশনের প্রজেক্ট চলছিল। আমি হলাম গিয়ে আদার ব্যাপারী, আমার কাজ ছিল রোজ কম্পিউটার সেকশনে গিয়ে আমাদের সফটওয়্যারটা ঠিকমত কাজ করছে কিনা তা দেখা এবং কোনো অদল বদল হলে তা করে দেওয়া বা তা করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। এইসব করতে গিয়ে নানা রকম লোকের সঙ্গে পরিচয় হত।  আমার বস আবার নিরামিষাশী পাঞ্জাবি ছিলেন, সঙ্গে এক বাঙালি ছিল সে আবার শনিবার নিরামিষ খাওয়া পাবলিক। তখন সে চুটিয়ে প্রেম করছে, মেয়েটির জেএনইউতে পিএইচডি-রতা। ওর বিকম পাস ও লাইব্রেরী সাইন্স ডিগ্রী নিয়ে কনফিডেন্স একেবারে তলানিতে। অ...

বৈদিক সাহিত্য, শিক্ষা ও হিন্দু ধর্ম

Image
  সাহিত্য ধর্মের মূল কথা ধরে রাখে। আজকের টিকে থাকা গুটিকয় ধর্মগুলির প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু ধর্মীয় পুস্তক আছে। যার মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে তার শিক্ষা ও দর্শনের প্রচার ও প্রসার হচ্ছে। যে সব ধর্ম হারিয়ে গেছে, লক্ষ করলে দেখা যাবে সেইসব ধর্মে কোন লিখিত গ্রন্থ ছিল না। লিপি আবিষ্কারের আগে এই প্রথাগত পুস্তক মানুষ শুনে তার স্মৃতিতে ধরে রাখত। সেই কারনেই বেদকে “শ্রুতি” বলা হয়। যেহেতু বেদ লিখিত অবস্থায় দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ছিল তাই এর শ্লোকগুলি জটিল সমাস-জর্জরিত ছিল না, যাতে মনে রাখার সুবিধা হয়। নানা ধর্ম নানা সময়ে অন্য ধর্মের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, গ্রামকে গ্রাম মানুষ খুন করা হয়েছে ধর্মবিনাশের জন্যে, তবুও কিছু ধর্ম আজও টিকে আছে তাঁর কারণ পালিয়ে বাঁচা মানুষের মনে ধর্মীয় সাহিত্য টিকে থাকত। তাই ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিলেও মানুষের মস্তিষ্ক হরণ করা যায় নি।  হিন্দুধর্ম একটি ধর্ম নয়, একে অনেকগুলি ধর্মের সহাবস্থান বলে মনে করা হয়। যেহেতু হিন্দুধর্ম প্রাচীন তাই এর সাহিত্যও সুবিশাল। হাজার বছর ধরে নানা ব্যাখ্যা নানা শিক্ষক বা গুরুরা লিপিবদ্ধ করে গেছেন। বেদ দিয়ে এর শুরু হলেও - উপনিষদ, স্মৃতি, সূত্র, ইতিহাস, দ...

আন্তর্জাতিক সত্যজিৎ রায় ও ১০০তম জন্মদিন

Image
          গ্লোবালাইজেশনের বহু আগে থেকেই সত্যজিৎ রায় আন্তর্জাতিক। তাঁর এই খ্যাতি রাতারাতি আসেনি।বরং এর পেছনে রক্ত জল করা অধ্যায় রয়ে গেছে। সত্যজিৎ মূলত যে কারণে সারা পৃথিবীতে পরিচিত তা হল তাঁর সিনেমা। যার মধ্যে বেশিরভাগই বাংলা সিনেমা যা পৃথিবীর অধিকাংশ লোকই বলতে বা বুঝতে পারেনা। সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা তৈরি করা শুরুর সেই সময়টার দিকে তাকালেই আমরা কিছুটা ধারনা পাব। তাঁর প্রথম সিনেমা পথের পাঁচালী ১৯৫৫ সালে রিলিজ করে। এরপর  প্রায় প্রতিবছরই একটি করে সিনেমা রিলিজ করতে থাকে -- অপরাজিত (১৯৫৬),  পরশপাথর (১৯৫৭), জলসাঘর(১৯৫৮), অপুর সংসার (১৯৫৯), দেবী (১৯৬০) ইত্যাদি।  এইভাবে চলছিল ভালোই কিন্তু সমস্যা দেখা দিল ১৯৬২ সালে কাঞ্চনজঙ্ঘা সিনেমা তৈরি হবার পরেই। ১৯৬৩ সালের শুরুর দিকের ঘটনা -- তখন সত্যজিৎ রায় ক্রমাগতই সম্মুখীন হচ্ছেন নানারকম বাধার। কাঞ্চনজঙ্ঘা সিনেমার জন্য রঙিন ফিল্ম সেসময় বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার ফিল্মের আমদানি কমিয়ে এনেছে। এর কারণ ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ। তারপরেই একটি চীনের সঙ্গে ছোটখাটো যুদ্ধের কারণে গোটা বাংলার সিনেমার জগতে নেমে এসেছে এক...

গীতাঞ্জলির নোবেল প্রাপ্তি, রবীন্দ্রনাথ ও কাঁকড়া বাঙালি

Image
।। ১ ।। বাঙালি কাঁকড়ার জাত। পৃথিবীর যেকোন প্রান্তেই সে থাকুক না কেন, বাঙালিরা প্রথম যে কাজটা করে সেটা হলো একটি ক্লাব তৈরি করা। তারপর সেই ক্লাবে নিয়মিত খাওয়া দাওয়ার পর্ব মিটে গেলে একটি পূজার আয়োজন করা হয়। সেই পূজা কমিটিতে কে কী হবেন কী হবেন না সেই নিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই একটা দ্বন্দ্বের তৈরি হয় এবং তারপর সেই ক্লাব দুভাগ থেকে চার ভাগ থেকে আট ভাগ হতে হতে বহু ক্লাবের সৃষ্টি হয়। অপরদিকে যদি অন্যান্য ভারতীয় ভাষাভাষীদের আপনার লক্ষ্য করেন তবে দেখবেন, তাদের মধ্যে কী সাংঘাতিক ঐক্য। আমেরিকায় তামিলদের একটি শক্তিশালী সংগঠন আছে। এমনকি তামিলরা মিলিতভাবে এমআইটি ইনস্টিটিউটে (MIT) ডোনেশন দেয়। তারফলে একটি তামিল চেয়ার ও কিছু তামিল ছাত্রছাত্রীরা সেখানে পড়াশোনার সুযোগ পায়। পাঞ্জাবিরাও একইভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে চলেছে তাদের পাঞ্জাব প্রদেশের বাইরে। সে ভারতেই হোক বা বিদেশে যেকোন জায়গায়, পাঞ্জাবিরা অন্য আরেকজন সদ্য আগত পাঞ্জাবিকে মুক্তহস্তে সাহায্য করে প্রতিষ্ঠিত হবার জন্যে। তবে তা কখনই এককালীন নয়, নিঃশর্তভাবে সাহায্যপ্রাপ্ত ব্যক্তিটিও সেই টাকা বিনা দ্বিধায় ফিরিয়ে দেয় প্রতিষ্ঠিত হবার পরে। এর প...

৫ টাকায় বই ও প্রিন্ট অন ডিমান্ড

 শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও এটাই হচ্ছে। বাংলার এক প্রথম সারির প্রকাশক বেশ কিছু বই মাত্র ৫ টাকায় ছেড়ে দিচ্ছেন। হতেই পারে সেগুলি হয়ত বিক্রি হচ্ছিল না, আমার তাতে কী? কিন্তু আমার একটি প্রশ্ন এই বই বিক্রির টাকা লেখকরা পাবেন তো? মানে পেলেও ঠিক কতটা পাবেন? শতকরা ১০% হারে রয়্যালটি পেলে বই পিছু ৫০ পয়সা করে পাবেন। প্রকাশক কি বলবেন, 'বই ছাপানোর পয়সাই ওঠেনি তার আবার রয়্যালটি কোথা থেকে আসবে?' একজন বই ক্রেতা হিসাবে আমার এইসব ভাববার কথা না। বরং খুশি মনে বেশ কিছু বই ৫ টাকায় কিনে আলমারি ভরিয়ে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু আমার মনে প্রশ্ন জাগছে।  দেশ পত্রিকাও একসময় ৫ টাকায় নেমে এসেছিল। তবে দেশ চলে মূলত বিজ্ঞাপনের টাকায়। সেখানে লাভ থাকেই। তাই কম দামে ছাড়লেও দেশ তার লেখকদের পয়সা নিয়ে কোন সমঝোতা করেনি। তাই এর সাথে তুলনা করলে চলবে না। কোন বই চলবে কোন বই চলবে না বলা মুশকিল। এমন সব বই বেস্ট সেলার হয়ে যায় যেগুলি কোন প্রকাশক কল্পনাই করতে পারে না। ফরাসী লেখক মারসেল প্রুস্তের "অতীতের স্মৃতিরোমন্থন" নামে একটি বই স্বয়ং আন্দ্রে জিদ এক প্রকাশকের হয়ে নাকচ করে দিয়েছিলেন। পরে অবশ্য জিদ নিজের ভুল স্বীকার ক...

আলোকবর্ষ

একটা আলোকবর্ষ দূরে আমার ভালোবাসা তোমাকে দিলাম আলোকবর্ষ তো কোন সময় নয় কেবলই দূরত্ব। অথচ কেমন সময়ের সাথে সাথে দূরত্ব বাড়তেই থাকে  রাস্তার পাশের গাছগুলি কাটা পড়ে লাশকাটা ঘরে তবু কিছুটা সেলাই করা হয় কিন্তু যে সময়টা কাটা পরে গেছে তা জুড়লে  কয়েক আলোকবর্ষ হয়ে যাবে।  আবারও বলছি আলোকবর্ষ কোন সময়ের হিসেব নয় এ দিয়ে কেবল দূরত্বই মাপা হয়।  তবু সময়ের সাথে সাথেই তো দূরত্ব বেড়ে চলে আমাদের অর্থনৈতিক হিসেবের যোগ-বিয়োগের মাঝে কয়েক আলোকবর্ষ ব্যবধান ।। -- ঋজু, ১২ মার্চ ২০২১ ব্যাঙ্গালোর